• ডিসেম্বর 06 2022

পশ্চিমী জনমতের উপর শীতের প্রভাব দেখার জন্য রাশিয়া অপেক্ষা করবে, আর ইউক্রেন একটি দীর্ঘস্থায়ী ভরবেগের জন্য তার যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতির উপর নির্ভর করছে। ইউক্রেনের অবস্থান নিয়ে পশ্চিমীরা যে অস্থির হয়ে উঠছে, তা মার্কিন ও রুশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাকচ্যানেল আলোচনা থেকে স্পষ্ট।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন,ভারত,আন্তর্জাতিক বিষয়,রাশিয়া ও ইউরেশিয়া, কৌশলগত অধ্যয়ন

এই বছরের শুরুতে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বিশ্বব্যাপী অনেক মনোযোগ আকর্ষণ করছে। প্রথমত, রাশিয়ার আক্রমণের প্রকাশ্যে নিন্দা করতে ভারতের অনীহা এবং সম্ভাব্য অংশীদার হিসাবে ভারতের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে পশ্চিমের রাজধানীগুলিতে প্রচুর উত্তপ্ত কথা হয়েছিল। ধীরে ধীরে, ভারতের পাল্টা জবাবের পর, ভারতের বিদেশনীতির ভঙ্গিমাটির পেছনের যুক্তিগুলি আরও ভাল করে বোধগম্য হয়। ইতিমধ্যে নয়াদিল্লিও পথ বদল করেছে। সংঘাতের বিষয়ে খোলাখুলিভাবে কথা বলতে অস্বীকার করার পর ভারতীয় নীতি নির্ধারকেরা বিশ্ব অর্থনীতিতে সংঘাতের প্রভাব, খাদ্য ও জ্বালানির দাম এবং জাতিরাষ্ট্রগুলির সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার পবিত্রতা সম্পর্কিত নিয়মাবলি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেন।

এখন রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতে ভারতের অবস্থান সব পক্ষই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সেপ্টেম্বরে সাংহাই কো–অপারেশন অর্গানাইজেশনের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রকাশ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বলেছিলেন যে এখন ‘‌যুদ্ধের সময় নয়’‌, তখন সারা বিশ্বে তা ব্যাপকভাবে রিপোর্ট করা হয়েছিল, এবং অনেক পশ্চিমী নেতা এর উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন একথা বোঝাতে যে সংঘর্ষের কারণে বিশ্ব চাপের মধ্যে আছে। অতি সম্প্রতি, পুতিন উল্লেখ করেছেন যে বৈশ্বিক বিষয়ে নয়াদিল্লির ভূমিকা সামনের দিনগুলিতে বাড়বে, এবং ‘‌ভবিষ্যৎ ভারতের’‌। এমনকি তিনি শুধু মোদীকে ‘‌একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক’‌ হিসাবেই নয়, ভারতীয়দেরও প্রশংসা করেছেন ‘প্রতিভাবান’‌ হিসাবে, যারা উন্নয়নে অসামান্য ফলাফল অর্জনের মহান সম্ভাবনার পথে ‘‌চালিত’‌।

রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের অবসান ঘটাতে ভারত বৃহত্তর ভূমিকা পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন খবর প্রকাশের সময়েই বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মস্কো সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছে। যদিও আপাতভাবে জয়শঙ্কর ‘বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার অন্তঃসরকার কমিশন’‌–এর (আই আর আই জি সি–টি ই সি) একটি বৈঠকের যুগ্ম–সভাপতিত্বের জন্য মস্কো গেছিলেন, তবে ভারতের জি–২০ ও এসসিও প্রেসিডেন্সিগুলি পরের বছরেও দিল্লি–মস্কো সম্পর্ককে বিশ্বব্যাপী মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতেই রাখবে। শীর্ষ সম্মেলনের জন্য এ বছর রাশিয়া সফরে যাওয়ার কথা মোদীরও। নয়াদিল্লিকে এমন সময়ে অংশীদারিগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে যখন রাশিয়া ও পশ্চিমের মধ্যে আস্থা তলানিতে পৌঁছেছে।

রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের অবসান ঘটাতে ভারত বৃহত্তর ভূমিকা পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন খবর প্রকাশের সময়েই বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মস্কো সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছে।

রাশিয়া–ইউক্রেন দ্বন্দ্ব যেভাবে ভারতের রাশিয়া নীতির মৌলিক বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছে, শীতল যুদ্ধ শেষের পর থেকে আর কোনও সময়ে তেমনটা ঘটেনি। এই ঘটনা ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের এমনভাবে এই অংশীদারির সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে বাধ্য করছে যেভাবে ভাবতে তাঁরা আগে আগ্রহী ছিলেন না। কয়েক দশক ধরে মূলত প্রতিরক্ষা বিক্রয়ের উপর ভিত্তি করে এই অংশীদারির একমাত্রিক প্রকৃতি স্পষ্ট ছিল, কিন্তু কেউই বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে রাজি ছিলেন না। আজ ভারতীয় বাহিনী যখন হিমালয়ের সীমানায় এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করে চলেছে, সেই সময় রাশিয়া তার নিজস্ব যুদ্ধে লড়তে গিয়ে তার সম্পদ নিঃশেষ করছে। এই রাশিয়ার উপর ক্রমাগত নির্ভরশীলতা দ্রুত ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে। তদুপরি, রাশিয়া–চিন অংশীদারির ভবিষ্যৎ কিছুকাল আগের মতো এখন আর অনিশ্চিত নয়। ‌যে মস্কো ভারতের কৌশলগত পুনর্নির্মাণে ভারত–প্যাসিফিকের কেন্দ্রিকতাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে, ভারতের ভবিষ্যৎ কৌশলগত ভঙ্গিতে তার মূল ভূমিকা সম্পর্কে ভারতীয়দের অনেককে বোঝানো কঠিন।

অন্যদিকে, গত কয়েক মাসে দেখা গেছে ভারত ও রাশিয়া তাদের শক্তির সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, এবং বেশ কয়েকটি পশ্চিমী শক্তির ক্রমবর্ধমান অস্বস্তি সত্ত্বেও দিল্লি রাশিয়া থেকে ছাড়প্রাপ্ত অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়িয়েছে। রাশিয়া অক্টোবরে ভারতের শীর্ষ তেল সরবরাহকারী ছিল, যা ভারতের মোট অপরিশোধিত আমদানির ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। পশ্চিমীদের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকার কারণে রাশিয়া যে ছাড় দিচ্ছে, তার ফলেই এই ঘটনা। নয়াদিল্লি রুশ তেলের দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণের জন্য জি৭ প্রস্তাবকে সমর্থন করতে আগ্রহী ছিল না। জয়শঙ্কর বলে চলেছেন যে ‘‌যখন তেলের দাম আমাদের শিরদাঁড়া ভেঙে দিচ্ছে’,‌ সেই সময় ভারতের সামনে রাশিয়ার তেল কেনা ছাড়া কোনও পথ নেই। তাঁর সাম্প্রতিক সফরের সময়ও জয়শঙ্কর একথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে ভারতের ‘‌মৌলিক বাধ্যবাধকতা’‌ হল ভারতীয় ভোক্তাদের বিশ্ব বাজারের সর্বোত্তম সম্ভাব্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। কিন্তু ভারত এটাও স্বীকার করে যে এটি টেকসই নয়, এবং তার সুযোগের জানালা শীঘ্রই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কাজেই আশ্চর্যের বিষয় নয় যে রাজনৈতিক মীমাংসা করতে দুই পক্ষের অক্ষমতা নিয়ে নয়াদিল্লিতে ক্রমশ বেশি করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যেমনটি প্রতিফলিত হয়েছে জয়শঙ্করের ‘এটি যুদ্ধের যুগ নয়’ বলে মোদীর বক্তব্যের পুনরুক্তিতে। তিনি ‘‌ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতি’‌ নিয়েও দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। শান্তিপ্রণেতা হিসেবে নয়াদিল্লির ভূমিকা সম্পর্কে হইচই তোলা সমস্ত রিপোর্টের পরেও গুরুতর আলোচনার কোনও জায়গা নেই, কারণ উভয় পক্ষই যুদ্ধে ‘‌জয়’‌ পাওয়ার জন্য  বিনিয়োগ করে চলেছে। পশ্চিমী জনমতের উপর শীতের প্রভাব দেখার জন্য রাশিয়া অপেক্ষা করবে, আর ইউক্রেন একটি দীর্ঘস্থায়ী ভরবেগের জন্য তার যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতির উপর নির্ভর করছে। ইউক্রেনের অবস্থান নিয়ে পশ্চিমীরা যে অস্থির হয়ে উঠছে তা মার্কিন ও রুশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাকচ্যানেল আলোচনা থেকে স্পষ্ট। কিন্তু বর্তমান অচলাবস্থা আগামী বছরের বসন্ত পর্যন্ত চলতে থাকলে ভারতের জন্যও সামনে শুধু কঠিন বিকল্প থাকবে।


এই ভাষ্যটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘দ্য ইকনমিক টাইমস’–এ।

মতামত লেখকের নিজস্ব।

Comments are closed.

সম্পাদক